দৃষ্টিপাতের দুই বছর পুর্তি উপলক্ষে শুরু হচ্ছে বাংলায় ব্লগ।

ইউনিকোড ব্যবহার করে এখন অতি সহজেই বাংলায় ব্লগে লেখা সম্ভব এবং যে কোন প্লাটফর্মে থেকেও আপনি বাংলা পড়তে এবং লিখতে পারবেন। আপনার কম্পিউটারে বাংলা স্ক্রীপ্টে লেখা দেখানো এবং টাইপের কোন সমস্যার সমাধানের জন্যে বাংলাপিডিয়ার এই তথ্যগুলো কাজে দেবে।

বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে না থাকলেও বাংলা কম্পিউটিং জনপ্রিয় হয়েছে খুবই হালে। এর কারন হচ্ছে প্লাটফর্ম সমস্যা। নব্বইয়ের দশকের শুরুর থেকে বাংলাদেশের পাবলিশিং ইন্ডাষ্ট্রীতে এপল ম্যাকিন্টস কম্পিউটারের ব্যবহার ছিল ব্যপক এবং প্রশিকা/বিজয় জাতীয় বাংলা ইনপুট সিস্টেমই ছিল অধিক ব্যবহৃত । যদিও এগুলোর অবদান অন:স্বীকার্য তবুও নির্দিষ্ট কোনো গঠন ব্যবহার করতোনা বা এখনো করেনা বলে এরা সমস্যারও সৃষ্টি করেছে অনেক। এ সম্পর্কে নামকরা ডেভেলপার অমি আজাদ লিখেছেন:

প্রশিকা/বিজয় দিয়ে লিখা একটি বাংলা ফাইল যদি অন্য একটি কম্পিউটারে নিয়ে খোলেন, যেখানে প্রশিকা/বিজয় বা তাঁদের ফন্ট নেই, তাহলে আপনি আবর্জনা ছাড়া কিছুই দেখতে পাবেন না। আপনি যদি একজন কম্পিউটার ব্যবহারকারী হয়ে থাকেন এবং প্রশিকা/বিজয় কোনো অফিস স্যুটে বাংলা লিখে থাকেন, তাহলে দেখবেন যে আপনার লেখার নীচে লাল দাগ দিয়ে কম্পিউটার আপনাকে বলছে যে আপনি ভূল টাইপ করছেন, এবং মাঝে মাঝে আবার আপনার লেখা বানানকে সয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক করে দিতে গিয়ে আপনাকে বিপদে ফেলবে। কারন ইংরেজী অক্ষরগুলির স্থানে বাংলা লেখা (টাইপ) বসিয়ে দিয়ে বাংলা দেখানো হয়, কিন্তু কম্পিউটার মনে করছে যে আপনি ইংরেজীই লিখে যাচ্ছেন।

কম্পিউটারে ভাষার একটি নির্দিষ্ট গঠন থাকার সুবিধাগুলি হলো আপনি যেখান থেকেই এই ভাষা ব্যবহার করেন, আপনি একই জিনিস ব্যবহার করবেন। যেমন আমি যদি ইংরেজীতে একটি ই-মেইল লিখে পাকিস্তানে পাঠাই, প্রাপক সেটা সঠিকভাবেই দেখতে পাবেন।

এবং এই নির্দিষ্ট গঠন আনতেই ইউনিকোড ইনপুট সিস্টেমের গোড়াপত্তন। ২০০১ সালে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম (www.unicode.org) এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্টেন্ডার্ডাইজেশন (www.iso.org) এর যৌথ উদ্দ্যোগে ইউনিকোড ৩.০ সংস্করণে প্রথমবারের মতন বাংলা ভাষা যোগ করা হয় কিন্তু তা ছিল সমস্যাবহুল। ২০০৫ সালে ইউনিকোড গঠন ৪.১ এর মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়। ইউনিকোড সম্বন্ধে আরও জানতে চাইলে এস এম মাহবুব মোর্শেদ, অমি আজাদড: মশিউর রহমানের লেখাগুলো পড়ুন।

বলা বাহুল্য ইউনিকোড বাংলা ব্লগিংয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়। জনপ্রিয় ব্লগিং প্লাটফর্মগুলো, যেমন ওয়ার্ডপ্রেস, ব্লগার ইত্যাদি নন-ইউনিকোড সাপোর্ট না করায় পুর্বে কেউ কেউ রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রচেষ্টাও করেছিল। আর বাংলা ব্লগিংয়ে জোয়ার আনা ‘বাঁধ ভাঙার আওয়াজ’ শুরুতে বিজয় ও ফোনেটিক দুই প্লাটফর্ম সাপোর্ট করলেও এখন পুরোপুরি ইউনিকোড সাপোর্ট করে।

এখন অতি সহজেই বাংলায় ব্লগিং বা মন্তব্য করা সম্ভব। কনফুসিয়াস লিখেছেন বাংলায় কি করে ব্লগ বানানো যায়। আপনার পিসিতে কোন বাংলা প্লাটফর্ম না থাকলে এই এডিটর দিয়ে ওয়েব ব্রাউজার দিয়ে সরাসরি বাংলায় লিখতে পারবেন কোন সফটওয়্যার ছাড়াই। এখানে বাংলা ব্লগসমুহের একটি তালিকা এবং বাংলা কম্পউটিং এর বিবিধ লিন্ক রয়েছে।

এখন দেখা যাক বাংলা ব্লগিং কি করে আমাদের দেশে পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের দেশের অনেকেই ইংরেজী ভাষায় সাবলীল নয়। মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশ বা গদ্য/কবিতা সৃষ্টির শিহরনই আলাদা। তাই বাংলা ব্লগিং হতে পারে দেশীয় তরুনদের নতুন ক্রেজ। বাংলা ব্লগিং প্লাটফর্ম ‘বাঁধ ভাঙার আওয়াজ’ এর জনপ্রিয়তা প্রমান করেছে দেশে বাংলা ব্লগিংয়ের চাহিদা রয়েছে। এবং এর সাফল্য কি কম? ব্লগ হতে পারে লিটল ম্যাগাজিনের মত সুখপাঠ্য, হতে পারে আকর্ষনীয় ও অনুকরনীয়, বাড়াতে পারে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলাপের দুরন্ত সাহস।

যখন বেনামী ব্লগার যুঞ্চিক্ত “কোরান ক্যাডা লিখছে” বলে পোস্ট দিল তখন ‘বাঁধ ভাঙার আওয়াজ’ ব্লগে ঝড় উঠল। অনেকেই ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লেগেছে বলে শোরগোল তুলল। কিন্তু আরেকদল ঠান্ডা মাথায় যুঞ্চিক্ত’র যুক্ত খন্ডাল এবং প্রমান করল যে তার যুক্ত ভুল। ইতিমধ্য ব্লগ কর্তৃপক্ষ যখন ভয়ে পোস্টটি মুছে দিলেন তখন অনেক ব্লগার এর প্রতিবাদে ব্লগ ছাড়ার হুমকি দিল। তাদের যুক্তি ভলটেয়ারের সেই উক্তি: “আমি তোমাকে সমর্থন করিনা তবে জীবন দিয়ে হলেও তোমার বলার অধিকার সমুন্নত রাখব”। কর্তৃপক্ষ হার মানলেন কিন্তু জিতলেন তারাই বাংলায় স্বাধীন মতপ্রকাশের এমন সুযোগ করে দিয়ে। পত্রিকায় এরুপ কোন কিছু কোনদিনই ছাপা হতো না (সেল্ফ সেন্সরশীপ) অথবা ছাপলেও ব্লগারটিকে কেউ মুরতাদ ঘোষনা করত। গনতন্ত্রের সঠিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্যে শালীনভাব অপরের প্রতি সম্মান রেখৈ স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার জরুরি। যুক্তিই খন্ডাবে যুক্তিকে, অন্ধ বিশ্বাষের চেয়ে জানার ইচ্ছাই মানুষকে সঠিক পথ দেখাবে।

ব্লগের এই শক্তিকে ধারন করেই এখন থেকে দৃষ্টিপাতও মাতৃভাষায় আপনাদের কাছে নিয়ে আসবে সমসাময়িক বিষয়গুলো। আপনাদের আংশগ্রহন, সহযোগিতা ও উপদেশের প্রত্যাশা থাকল।