দেশভাগের ৬১ বছর হয়ে গেল গত সপ্তাহে ।  পশ্চিম বঙ্গে দেশভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ।  অনেক লেখালেখি হুয়েছে সেদেশে ৪০ দশকের সেই ঘটনাগুলি নিয়ে ।  কিন্তু বাংলাদেশের লেখকদের কলমে ঘটনাবহুল ৬০-৭০ দশকের কথাই উঠে এসেছে, দেশভাগ রয়ে গেছে আড়ালে ।    আমাদের কাছে ১৪ আগস্ট কেবলই ক্যালেন্ডারে আরেকটি দিন, আর আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ১৫ আগস্ট  ১৯৭৫, ১৯৪৭ নয় ।  কিন্তু ১৪-১৫ আগস্ট ১৯৪৭ আমাদের ইতিহাসেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ ।  সেই চিন্তা থেকেই আজকের লেখা ।  পূর্ব পাকিস্তান সময়ের দুটি উপন্যাসে কেমন ভাবে দেশভাগ এসেছে তাই আমরা দেখব ।

আবু রূশদের নোঙ্গর প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে ।  কাহিনীর শুরু ১৯৪৭ এর জুনে, কোলকাতায় ।  কামাল, গল্পের নায়ক, এই মহানগরেরই ছেলে ।  কিন্তু সে পারি জমায় নতুন দেশ পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে, বাবা ও ভাই কে ফেলে ।  কেন ?  পাকিস্তানের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ?  না, সে দেশত্যাগ করে চাকরীর আশায় ।  বাঙ্গালী মুসলিম দের পাকিস্তানে ভাল সম্ভাবনা ভারতের থেকে - এই হল কামালের চিন্তা । 

দেশভাগের কাহিনী, তা উপন্যাসই হোক আর চলচ্চিত্রে, বাংলাতেই হোক আর ইংরেজিতে, পাকিস্তানেই হোক আর ভারতে, এখানে হিন্দু-মুসলিম প্রেম থাকবেই ।  নোঙ্গরেও আছে ।  কামাল কোলকাতায় ফেলে আসে লতিকাকে ।  কিন্তু এই পরিণতিহীন প্রেম কাহিনী আমাদের দেখায় কামালের কাটখোট্টা স্বভাব - তার মধ্যে রোমাঞ্চের বড়ই অভাব, তাই শান্তিনিকেতন তার মনে দাগ কাটে না ।  অন্যদিকে, সে সাম্প্রদায়িকও নয় ।  সে তেমন কিছু হিন্দু-মুসলিম পার্থক্য দেখে না - খাওয়া দাওয়া ছাড়া । 

যাই হোক, কামাল পাকিস্তানে আসে, চাকরী পায়, বিয়ে করে ।  কিন্তু পাকিস্তানে সে খুব একটা সুখী নয় ।  তবে যেখানে পশ্চিম বঙ্গের উপন্যাসে দেশান্তরী চরিত্ররা nostalgiaতে ভোগে ( পূর্ব-পশ্চিম-এর প্রতাপ এর কথা মনে করুন), কামালের সমস্যা অন্যখানে ।  সে পাকিস্তানে সুখী নয় কারন পাকিস্তান তাকে আশাহত করে ।  পাঠক, চিন্তা করে দেখুন ব্যাপারটা ।  একজন কাটখোট্টা লোক, যার মধ্যে কোন রোমাঞ্চ অথবা রাজনৈতিক আদর্শ নাই, সেও পাকিস্তানে নিরাশ !

কিভাবে কামাল এই নিরাশা কাটায় ?  সে উপলব্ধি করে পূর্ব পাকিস্তানেই তার নোঙ্গর ফেলতে হবে ।  সে দেশভাগের বাস্তবতা মেনে নেয়, কিন্তু এই দেশের ১৯৪৭-পূর্ব ইতিহাস, আর পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পার্থক্য-ও সে পরিষ্কার ভাবে দেখে ।  তার গল্প শেষ হয় এক নতুন উপলব্ধির মাধ্যমে, নতুন এক আত্ম-পরিচয়ের সন্ধানে ।  আজকে আমরা সেই পরিচয়কেই কি বাংলাদেশী বলি না ?

আবুল ফজলের রাঙ্গা প্রভাত প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে ।  এই গল্পের নায়কের নামও কামাল, কিন্তু এই কাহিনী হচ্ছে গ্রাম বাংলা আর মফসসলে ।  কামাল বড় হয় চট্টগ্রামের কাছে একটি গ্রামে, তার ধার্মিক, কিন্তু অসাম্প্রদায়িক দাদা এনামুল হোসেনের কাছে ।  এনাম সাহেব আর তাঁর বন্ধু চারু বাবু সম্পর্কে আমরা দেখি হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান ।  আর চারু বাবু’র মেয়ে মায়া’র সাথে গড়ে ওঠে কামালের সম্পর্ক ।

দেশভাগের পরেও এই সহাবস্থান বজায় থাকে কিছুদিন ।  আর চারু বাবু’র মেয়ে মায়া’র সাথে গড়ে ওঠে কামালের সম্পর্ক ।  কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে যায় যখন সাম্প্রদায়িকতার গরম হাওয়া এসে লাগে এই গ্রামেও ।  আততায়ীর হাতে নিহত হন চারু বাবু ।  মায়া কি করে তখন ?  সে কি তার মা ও ভাই-এর সাথে কোলকাতায় চলে যায় ?

এই সময় আমরা একটি খুবই তাতপরযপূর্ন ব্যাপার দেখি ।  আমরা দেখি যে বহু পুরুষের বন্ধুত্ব থাকার পরেও কামাল আর মায়ার পরিবারের কেউ কখনো আরেক বাড়িতে খায়নি ।  এই রান্নাঘরের বিভাগই দেশভাগের মূলে, কামাল বলে । 

মায়া কিছুদিনের জন্য কোলকাতায় চলে যায় ।  আর কামালের গ্রামে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা আর হিংসা ছড়িয়ে পরে ।  সেই হিংসার সাথে লড়তে গিয়ে আহত হয় কামাল ।  আর তার কাছে ফেরত আসে মায়া ।  কাহিনী শেষ হয় সাগর পারে, এক নতুন সূর্যোদয়ে ।   

নোঙ্গরের কামালের মত এই কামালেরও রাজনৈতিক উপলব্ধি হয় ।  সে উপলব্ধি করে বিশ্বমানবতা আর শ্রেনীহীন সমাজের মাঝেই আছে মুক্তি ।  আজকে, ৫০ বছর পরে, আমরা কি সেই চিন্তা থেকে অনেকখানি সরে আসি নাই ?

(এই লেখাটি মুক্তি ব্লগেও পোস্ট করা হয়েছে ।  উপমহাদেশের সাহিত্যে দেশভাগ সম্পর্কে জানতে চাইলে দেখুন নিয়াজ জামানের A Divided Legacy - the partition in selected novels of India, Pakistan, and Bangladesh.) 

এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা