অল্প যে কয়েকটি বাংলা উপন্যাস পড়েছি তার মধ্যে অন্যতম হল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব পশ্চিম’ । উপন্যাসের শুরু গত শতাব্দীর ৩০এর দশকে, কলকাতায়, কলেজের ছাত্র দুই বন্ধু - মামুন ও প্রতাপ - কে নিয়ে । ঐতিহাসিক কারনে দেশ ভাগ হওয়ার পর দুই বন্ধুও আলাদা হয়ে যান । তাদের পরিবারের ওপর পরে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব । বহু চড়াই উতরাই পার হয়ে কাহিনীর শেষ হয় ১৯৮০র দশকের মাঝামাঝি, যখন মামুন ও প্রতাপের জীবন ফুরিয়ে এসেছে, আর পরের প্রজন্মের চরিত্ররা ঢাকা ও কলকাতা ছেড়ে পারি দিয়েছেন বিলেত ও মার্কিন মুল্লুকে । সেদিন একটি ছবি দেখতে দেখতে এই উপন্যাসটির কথা মনে হচ্ছিল ।
সেদিন দেখলাম মনিকা আলি’র কাহিনী অবলম্বনে সারা গ্যাভ্রনের পরিচালিত ব্রিক লেন । পাঠক নিশ্চয়ই জানবেন ব্রিক লেন হোল লন্ডনের বাংলাটাউন, আর পশ্চিমা দুনিয়ায় সবথেকে বড় বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা । পুর্ব লন্ডনের এই বাংলাদেশী সমাজের পটভূমিকায় ছবিটির গল্প (আমি ছবি’র কথাই বলব, যদিও বইটির কথাও বলা যায়) । অন্যতম চরিত্র হল নাযনীন, যে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার থেকে অনেক বয়সী চানুকে বিয়ে করে বিলেতে আসে । নাযনীনের দৃষ্টিতে দেখান হয়েছে দেশান্তরী এই সমাজকে ।
ছবিটি চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ হিসাবে কেমন হয়েছে সে বিচার আমি যোগ্যতর লেখকের ওপর ছেড়ে দিলাম । নাযনীনের কথায় ফিরে আসি । সালমান রুশদী অনেকবার লিখেছেন সব দেশান্তরী মানুষই রূপান্তরিত মানুষ (all migrants are translated people), আর প্রতিটি রূপান্তরই হোল একটি নতুন সৃষ্টি (each translation is a new creation) । নাযনীনের রূপান্তর, নিশ্চুপ গৃহবধু থেকে স্বাবলম্বী নারী তে, হোল এই গল্পের কেন্দ্রে ।
নাযনীনের মতই বিয়ের পর বিদেশে আসে অসীমা - ঝুম্পা লাহিড়ী’র কাহিনী অবলম্বনে মীরা নায়ারের পরিচালিত নেমসেক (এই ছবিটি দেখেছিলাম ঠিক বছর খানেক আগে) । অসীমাও রূপান্তরিত হয় দেশান্তরী হওয়ার ফলে । কিন্তু নাযনীনের রূপান্তর আর অসীমার পরিবর্তন মোটেই এক নয় । পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নাযনীনের বিদ্রোহে নাই বিপ্লবী স্লোগান অথবা সমাজবিদ্যার তত্ব । কিন্তু নাযনীনের মত কত অবব্রুদ্ধ নারী আছে আমাদের সমাজে ? দেশের কথা বাদ দেই । আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশী সমাজে কার সংগ্রাম বেশী প্রতিনিধিত্বশীল - নাযনীনের না অসীমার ?
প্রথম প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ছাড়াও, দ্বিতীয় প্রজন্মের বেদনার কথাও উঠে এসেছে ব্রিক লেনে । করিম চরিত্রটি হোল এই নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি । তাকে লড়তে হয় আত্মপরিচিতি সংকটের (identity crisis) সাথে । ‘যখন বড় হয়েছি তখন বাংলাদেশী ছাড়া অন্য কিছু হতে চাইতাম, সাদা, কাল, যে কোন কিছু’, সে বলে । আত্মপরিচিতি সংকট তো নেমসেকে’র গোগোলেরও । কিন্তু যদিও করিম ও গোগোল দুজনেরই এক ধরণের সংকট হলেও, দুজনের সমাধানের উপায় মোটেও এক নয় । গোগোলের বিভ্রান্তি কাটানোর চেষ্টায় আমরা দেখি সম্পর্কের ওঠানামা - তার বাবার সাথে, তার প্রেমিকা/স্ত্রীর সাথে ।
গোগোলের কাহিনী আসলে খুবই চেনা । হয়ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নয়, কিন্তু ছোট বা বড় পর্দায়, কিংবা আমাদের পশ্চিমা বন্ধু বান্ধবদের মাঝে কি আমরা গোগোল - গোগোলের ভালবাসার অন্বেষণ কি সেক্স এন্ড দা সিটি’র ক্যারি অথবা শার্লটের তালাশের থেকে খুব একটা আলাদা ? যত সংস্কৃতির সংঘাত (clash of culture) হোক না কেন, গোগোলের সুখ দুঃখ হাসি কান্না কি শেষ বিচারে আর পাঁচ জন বড় শহর বাসী পশ্চিমা X প্রজন্মের মতই নয় ?
করিমও বিভ্রান্তি কাটাতে বেছে নেয় এমন এক সম্পর্কের যার নাই কোন পরিণতি । কিন্তু ওই সম্পর্কের বাইরেও আছে করিমের লড়াই । তাকে লড়তে হয় লন্ডনের রাস্তায়, বর্নবাদী গুন্ডাদের বিরুদ্ধে । গোগোলের দুনিয়ায় ৯/১১ কিভাবে আসে আমরা জানি না, কিন্তু করিমের জন্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ হোল কঠিন বাস্তবতা । করিমের আশ্রয় হয় মুসলিম পরিচয়ের রাজনীতি, যার প্রকাশ সব সময় অহিংস নয় ।
তাও ভাল করিমের অবস্থা জ্যাডি স্মিথের হোয়াইট টীথ এর মিল্লাতের মত নয় (ঘটনাক্রমে, একই অভিনেতা করিম ও মিল্লাত দুজনের চরিত্রেই অভিনয় করেছেন) । মিল্লাতের বাবা তার যমজ ভাই মজিদ কে দেশে ফেরত পাঠান বাঙ্গালী হয়ে বড় করার জন্য । মজিদ বিলেতে ফেরত আসে পাক্কা সাহেব হয়ে, আমাদের নব্য উপনিবেশবাদী শিক্ষা ব্যাবস্থার কল্যাণে । আর মিল্লাত ? তার ঠাঁই হয় Keepers of the Eternal and Victorious Islamic Nation এ!
করিম বা মজিদ/মিল্লাতের সাথে গোগোলের তফাত কোথায়? কোথায় তফাত নাযনীনের সাথে অসীমার? অবশ্যই অর্থনৈতিক ব্যাবধান, যার মুলে হোল শিক্ষার ব্যাবধান, এক প্রধান বিষয় । গোগোলের বাবা, ও অসীমার স্বামী, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক । নাযনীনের স্বামী বেকার, মজিদ/মিল্লাতের বাবা কাজ করেন এক রেস্তরাতে, করিমের বাবা একজন বাসচালক । নাযনীনের জন্ম বাংলাদেশের এক গ্রামে, আর অসীমা এসেছে কলকাতার এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে । বিলেতেই বলুন আর মার্কিন দেশে, কানাডায়, ইতালীতে অথবা অস্ট্রেলিয়াতেই বলুন, দেশান্তরী বাংলাদেশীদের মধ্যে কাদের পাল্লা ভারী - ব্রিক লেনের চানু আহমেদের, না নেম সেকের অশোক গাঙ্গুলীর?
কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যাবধানই কি সব ? সেই প্রশ্ন নিয়েই মনে হচ্ছিল পূর্ব পশ্চিমের কথা ? চানু-নাযনীনের অবস্থা অশোক-অসীমার থেকে অনেক আলাদা হতে পারে, কিন্তু মামুন আর প্রতাপ দুজনেই কিন্তু পূর্ব বাংলার অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে । দেশভাগের ফলে অবস্থা খারাপ হয় প্রতাপের । তাকে করতে হয় সপরিবারে দেশত্যাগ । কলকাতায় তাকে লড়তে হয় অভাবের সাথে, সহ্য করতে হয় পুত্রশোক । তুলনায় মামুনের বৈষয়িক অবস্থা অনেক ভাল - তিনি হন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম সম্পাদক, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একজন সংগঠক । কিন্ত, সব কিছুর পরেও, প্রতাপের ব্যাক্তিজীবনের প্রাপ্তির সাথে মামুনের অশান্তি তুলনা করুন ? আমি জানি না সুনীল কি মনে করে দুই বন্ধুর জীবন এভাবে লিখেছিলেন । কিন্তু আমরা যদি দুই বন্ধুর মধ্যে দুই বাংলার রাজনৈতিক বিবর্তন দেখি - একদিকে শত দারিদ্র্যের মধ্যেও গণতন্রের স্বাভাবিকতা, আর অন্য দিকে স্বাভাবিক হল জরুরী সংকট - তাহলে কি খুব ভূল করব ? আর যদি বলি সেই রাজনীতির উত্তরাধিকারই হল নাযনীন আর করিমের জীবন, সেটাও কি খুব একটা ভুল হবে?
এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা
- পূর্ব পাকিস্তানের উপন্যাসে দেশভাগ - August 19th, 2008
- চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ - March 29th, 2008
- বিদেশে একুশে - March 15th, 2008
2 বক্তা মন্তব্য করেছেন " দুই বন্ধু, দুটি চলচ্চিত্র আর কিছু চিন্তা " লেখাটিতে।
অনুসরন করুন comment rss অথবা Trackback রাখুন।[...] Monica and Zadie. A terrific new piece by Jyoti in the Bangla blog, exploring the fate of our immigrants and ultimately asking questions about the [...]
Nice
মন্তব্য করুন