প্রতি বছর স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে TVতে বিশেষ অনুষ্ঠান দেখান হয় । থাকে গানের অনুষ্ঠান, স্মৃতি কথা, আর আলোচনা । আর থাকে চলচ্চিত্র । এই লেখা মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে, একজন সচেতন দর্শকের দৃষ্টি থেকে । আশা করি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ভাল লাগবে ।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্রের পর্দায় ভালভাবে তুলে ধরা খুব একটা সহজ নয় । চিন্তা করুন একবার কতগুলি dimension জড়িত । যুদ্ধের পটভূমি নিশ্চয়ই দেখান উচিত, কিন্তু কতটা ভূমিকা থাকবে ? কেবলই যুদ্ধের কাহিনী হলেও দেখুন কতকিছু আসতে পারে । যুদ্ধের শুরু ঢাকাতে ২৫শে মার্চের crack down দিয়ে, কিন্ত এর পর যুদ্ধ ছড়িয়ে পরে সারা দেশে । প্রথমে পাকবাহিনী আক্রমণ করে জেলা শহর গুলি, তারপর গ্রাম । সবখানে চলে গণহত্যা । আর এই আক্রমণের সাথে সাথে কোটি মানুষ বাধ্য হয় ঘর ছেড়ে যেতে - প্রথমে ঢাকা ছেড়ে মফসসল, তারপর গ্রাম, এবং অনেকের জন্য গ্রাম ছেড়ে ভারত । আর একই সাথে ঘটে প্রতিরোধ - প্রথমে বিদ্রোহ, তারপর সংগঠন, আর তারপর পাল্টা আঘাত । বছর শেস হয়ে আসে আর এগিয়ে আসে বিজয় ।
এত কিছু একসাথে দেখাতে গেলে দরকার বিশাল production, অনেক budget । আর সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু এভাবে চিন্তা করুন - যুদ্ধের শুরু মার্চে, গরম পরেনি তখনো, আর শেষ ডিসেম্বরের ঠান্ডায়, মাঝে বর্ষা ও শরত, নয় মাসের যুদ্ধ দেখাতে হলে shoot করতে হবে তিন চার বার আলাদা আলাদা ভাবে, কারন আমাদের দেশের রূপ একেক ঋতুতে একেক রকম ।
এই কথা গুলি বলেছিলেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের একটি TV সাক্ষাতকারে বেশ কয়েক বছর আগে । দেশ স্বাধীন হবার পরপরই কিছু চেষ্টা হয় সমগ্র যুদ্ধটি পর্দায় তুলে ধরার । মাসুদ পারভেজ ও চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’ এই চেষ্টা গুলির মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে নামকরা । দুই নির্মাতা, এবং জড়িত সবার প্রতি - যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন - যথেষ্ট সন্মান দেখিয়েও বলা যায় যে এই ছবিটি দেখলেই তারেক মাসুদ যা বলেছেন তার যৌক্তিকতা বোঝা যাবে ।
এবং সেই জন্যই পরবর্তি প্রজন্মের চলচ্চিত্রকাররা সমগ্র যুদ্ধ বাদ দিয়ে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়্ নিয়ে কাজ করেছেন । তারেক মাসুদের নিজের নামকরা ছবি ‘মাটির ময়না’-তে যুদ্ধ সরাসরি এসেছে গ্রামে পাকবাহিনীর আক্রমণ দিয়ে, কিন্তু ছবিটির পটভূমিকায় আছে বাঙ্গালী মুসলমানের আত্মপরিচয়, আছে বাংলার ইসলামের নানা রূপ । গত কয়েকবছরের আরেকটি দর্শকনন্দিত যুদ্ধের ছবি হল তৌকির আহমেদের ‘জয় যাত্রা’ । এখানে যাত্রা হল স্বাধীন বাংলা’র উদ্দেশ্যে, যাত্রা’র শুরু গ্রামে পাকবাহিণীর গণহত্যা দিয়ে, শেষ মুক্তাঞ্চলে । একই ধরণের কাহিনী হল হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, আর একই পরিচালকের ‘আগুনের পরশমনি’-তে এসেছে মুক্তিবাহিনীর ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধ ।
মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে, এবং নাটকে, যে সময়টা সাধারণত উপেক্ষিত থাকে তা হল যুদ্ধের শেষ কয়েক মাস । অবরুদ্ধ ঢাকাতেই বলুন আর সীমান্তের উদবাস্তু শিবিরেই হোক, অক্টোবরের শেষ থেকেই এটা স্পষ্ট হচ্ছিল যে বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানের দখল শিথিল হয়ে আসছিল । নভেম্বরের শেষে ছিল সারাদেশে মুক্তিবাহিনীর সাড়াশী আক্রমন । বোঝা যাচ্ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আসন্ন । কেমন ছিল সেই দিন গুলি ? কেমন কেটেছে পাকবাহিণী আর আল বদরদের নজরদারির মধ্যে একাত্তরের রমযান (অক্টোবর-নভেম্বর) ? কি ছিল ঘরছাড়া কোটি মানুষের অবস্থা ? কসবা ও হিলি’র যুদ্ধে (অক্টোবর-নভেম্বর) বিজয়ের পর মুক্তিবাহিনীর মনোবল কতটা বেড়েছিল ? ভারতীয় যুদ্ধ বিমান আকাশে দেখে ঢাকাবাসীর কেমন লেগেছিল ? কেমন ছিল সেই দিনটি যেদিন মুক্ত হল যশোর, কুমিল্লা, রংপুর ? কেমন ছিল ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ - ঢাকায়, জেলা শহরগুলিতে, গ্রামে, সীমানার ওপারে ?
কোন চলচ্চিত্রকার কি তুলে ধরবেন এই দিন গুলি পর্দায় ?
আর production ও budget এর অভাবে কি সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ কোনদিনই আমরা বড় পর্দায় দেখতে পারব না ?
অনেকে হয়ত বলবেন সরকারী সাহায্যের কথা । আমি সেই দলে নাই । সরকারের কি দায়িত্ব নাই এগিয়ে আসার, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ? অবশ্যই আছে । কিন্তু আমি তো ইতিহাস শিক্ষার কথা বলছি না । আমি বলছি সৃজনশীল শিল্পের কথা । সরকারী আমলারা হয়ত ‘সত্য’ ইতিহাস নিয়ে পাঠ্যসূচি বানাতে পারেন, কিন্তু শিল্প সাহিত্যের মধ্যে তাদের যত কম আনা যায় ততই ভাল - দলিয় রাজনীতির দলিয় ইতিহাসের কথা না হয় বাদই দিলাম ।
তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোন epic ছবি হবে না ? হতে হলে বেসরকারী খাতকে এগিয়ে আসতে হবে । কিন্তু, কোন নির্মাতা এমন একটি প্রকল্পে টাকা খাটাবেন কি - ঝুকি টা কি অনেক বেশী নয় ? ঝুকি তো অনেক বটেই, তবে তা কিছুটা হলেও লাঘব হবে যদি কাহিনী যথেষ্ট যুতসই হয় ।
সৌভাগ্যক্রমে সেরকম চিত্রনাট্যের উপযোগী অন্তত দুটি কাহিনী আছে ।
প্রথমটি সত্য ঘটনা, গত বিশ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কে সমুন্নত রাখছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে । এই কাহিনী হল অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর । এই কাহিনী হল গেরিলা বাহিনীর । প্রিয় পাঠক, আমি বলছি জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিন গুলি’র কথা ।
দ্বিতীয়টি উপন্যাস, ইংরেজীতে লেখা, এই সেদিন । লেখিকা যুদ্ধোত্তর প্রজন্মের, এবং বিষয় বস্তুতে আছে প্রজন্ম পরিবর্তনের চিহ্ন । কিন্তু এখানেও আছে দখলীকৃত ঢাকা, গেরিলাদের কথা, আরো আছে মুজিবনগর (কলকাতার থিয়েটার রোড) । আর সবথেকে বড় কথা হল, এই বইএর চেতনা আর প্রথমটির একই । আমি বলছি তাহনিমা আনামের ‘A golden age’ এর কথা ।
কোন নির্মাতা কি এগিয়ে আসবেন না সাহস করে, কোন চলচ্চিত্রকার কি তুলে ধরবেন না এই epic কাহিনী গুলি বড় পর্দায় ?
(এই লেখাটি crosspost করা হয়েছে মুক্তি ব্লগে)
এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা
- পূর্ব পাকিস্তানের উপন্যাসে দেশভাগ - August 19th, 2008
- দুই বন্ধু, দুটি চলচ্চিত্র আর কিছু চিন্তা - April 17th, 2008
- বিদেশে একুশে - March 15th, 2008
4 বক্তা মন্তব্য করেছেন " চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ " লেখাটিতে।
অনুসরন করুন comment rss অথবা Trackback রাখুন।আমাদের ম্রিদুল সাহেব কিন্তু এটা করবেন বলেছেন। Goldnen Age পরে ওনার কি অনুভুতি হয়েছে জানি না। Goldnen Age কিন্তু লন্ডনে নাটক হিসেবে মঞ্চে আসছে শিগ গিরি।
ওরা এগারো জনের একটা ভাল নুতন ধারার চলচিত্র। অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী একি সময়ের আর একটি সুন্দর উদ্যোগ। আবার তোরা মানুষ হ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী তারুন্যের অবক্ষয় নিয়ে একটা সময়পোযোগী ছবি।
তবে যা নেই তা হচ্ছে একটা এপিক ছবি।
যে ভদ্রলোক এটা করতে পারেন, অন্তত যার এ ব্যাপারে যথেষ্ট passion, অভিজ্ঞতা, অর্থ, কারিগরি এবং সাংস্কৃতিক মূলধন রয়েছে, তিনি হচ্ছেন হুমায়ুন আহমেদ।
আগুনের পরশমনি একটা ক্ষুদ্র কিন্তু ভাল পদক্ষেপ। আমি জানি না, জোছনা এবং জননীর গল্প উপন্যাস টির চলচিত্রায়ন সম্ভব কি না।
এটা সত্যি, শতকোটি বার কাউকে রাজাকার বলে গাল দিয়ে যে সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব, একটা ভাল চলচিত্র দিয়ে তার চেয়ে লক্ষ গুন বেশী সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়।
একাত্তরের দিঙ্গুলি অথবা Golden Age এর কথা বলা হয়েছে। এছাড়া একাত্তর নিয়ে কি আমাদের ভাল কোন উপন্যাস অথবা গল্প আছে?
রুমি ভাই খুবই দামী কথা বলেছেন সচেতনতা সম্পর্কে । জয়যাত্রা ছবির একটি দৃশ্যে একজন মহিলা একটি বাচ্চাকে বুকে তুলে নেন, ধর্মের বিভাগের কথা চিন্তা না করে । আমরা ধর্ম্ননিরপেক্ষতা নিয়ে বহু তর্ক করতে পারি, কিন্তু ওই দৃশ্যটি বলে দেয় যে ১৯৭১ এ ধর্ম নিয়ে কোন ভাগ ছিল না ।
১৯৭১ নিয়ে নিশ্চয়ই আরো অনেক গল্প আছে যার চলচ্চিত্রায়ন সম্ভব । সত্যি কথা বলতে কি, আমি খুব বেশি বাংলা উপন্যাস পড়ি নাই । জোছনা এবং জননীর কাহিনী কি ?
হুমায়ুন আহমেদের শ্যামল ছায়া বইটির কাহিনী কিন্তু ছবির সাথে কোন মিল নাই । বইটি হল একদল মুক্তিযোদ্ধা একটি operation এ যাচ্ছে - এই কাহিনী নিয়েই কিন্তু একটি চমতকার ছবি সম্ভব ।
ম্রৃদুল, আরিফ ও নাঈম সাহেবদের তো অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে এরকম একটি ছবি করতে ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন ভালো চলচ্চিত্র আজো নির্মিত হয়নি । একটি চলচ্চিত্র নির্মানের সাখে আরো অনেক জড়িত, সেখানে অর্থকড়ি থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক কিছু জড়িত । আরিইতিহাস ভিত্তিক চলচি্চত্র নির্মানের সবচেয়ে বড় হ্যাপা হলো সেই সময়কে সেলুলয়েডের ফিতায় পুর্ণনির্মান করা. যা সহজ কথা নয় ।
কিন্তু চিন্তা করুন তো একটি ভালো চলচ্চিত্র নয় অন্ততৰ একটি ভালো সাহিত্য কর্ম তো সৃষ্টি হতে পারত , সেই অর্থে কি তেমন কোন সাহিত্যকর্ম আছে যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ প্রতিনিধিত করে ??
না , নেই । কে যেন বলেছিল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আমরা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ি যেজন্য মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সেই অর্থে কোন বড় কাজ আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় । মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে হবে তৃতীয়মাত্রা থেকে অর্থাৱ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে , তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি সত্যিকার শিল্পকর্ম (তা সাহিত্য কিঙবা চলচ্চিত্র, যাই হোক) তৈরী সম্ভব ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকগুলো চলচ্চিত্রই আছে তার একটি সঙক্ষপ্তি লিস্ট সঙযুক্ত লিঙক এ পাবেন । (http://sachalayatan.com/mrhrussell/13075 )
মন্তব্য করুন