খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েই চলেছে। কোন থামাথামির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এখন পর্যন্ত। পাইকারী ও খুচরা, দুই বাজারেই চালের দাম বাড়ছে দ্রুত বেগে - তা সে ভারত থেকে আসা মোটা চাল বলেন আর আমাদের দেশীয় চাল বলেন।

পাইকারী বাজারে চাল বিক্রি হয় মন হিসাবে। খুচরা বাজারে তা কেজিতে। দাম কতখানি বেড়েছে, জিজ্ঞেস করছেন?

- পাইকারী বাজারে মন প্রতি ৪০ টাকা, ৫০ টাকা এমন কি ৭০ টাকা করেও বেড়েছে সম্প্রতি।

- আর খুচরা বাজারে মাত্র দুই দিন আগে যেই চাল ৩১-৩২ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছিল, তা আজকে ৩৪-৩৫ টাকায় উঠেছে।

কিভাবে চলছে তাহলে গরীব মানুষের?

ডেইলি স্টারের সাংবাদিক চাল ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করেছিলেন যে দাম এতো বাড়ছে কেন? তাদের উত্তর শুনুন - Wholesalers at Babubazar, Badamtoli and Mohammadpur Krishi Market and Karwan Bazar in the capital blamed poor supply of various types of Indian rice for the ongoing price hike.

“Poor supply of Indian rice.” মানে ভারতীয় চালের সরবরাহ কমে গেছে। কেন কমেছে, সেটাও কিন্তু তেমন কোন বড় রহস্য নয়। আমরা সপ্তাহ দুয়েক আগে এই বিষয়ের উপর হালকা আলাপ করেছিলাম। বড় বড় চাল রপ্তানীকারক দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর ব্যাপারেই বেশী তৎপর এখন। পড়শী দেশে কি হলো সেটা তারা কেন দেখতে যাবে? প্রধান চাল উৎপাদকদের মধ্যে আছে ভিয়েতনাম, ভারত ও মিশর। এরা সবাই ইতিমধ্যে চাল রপ্তানী-রোধক ব্যবস্থা নিয়েছে।

এর মধ্যে থেকে ভারত সরকারের আরোপিত বিধিনিষেধের উপরে আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাল উৎপাদনের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে আমরা প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে নীচু ও মাঝারি মানের চাল ভারত থেকে কিনে আনি। কিন্তু ভারতে গত তিন বছর ধরে চালের উৎপাদন আটকে আছে ৯ কোটি টনের আশেপাশে (কোলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকার ভাষ্য)।

অপর দিকে ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে তাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বেড়েছে। এর মধ্যে চালও অন্তর্ভুক্ত।

তাই ভারতে চালের ডিমান্ড বাড়ছে, কিন্তু সাপ্লাই বাড়ছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভারতেও চালের কমতি দেখা দিতে পারে। ভারত হচ্ছে চীনের পরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ চাল উৎপাদক!! কিন্তু তাদের নিজস্ব বাজারেই চালের দাম বেড়েছে ৩০%!! এমতাবস্থায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশের চাল দেশেই থাকুক। তাই চালের রপ্তানী মূল্য (minimum export price) বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে অনেক। চাল ব্যবসায়ীরা সেই বিধি মানতে বাধ্য।

কিন্তু এতে ধরা খেয়ে যাচ্ছি আমরা। বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ টন চাল আমদানী করে বাংলাদেশ। কোলকাতার চাল ব্যবসায়ীরা নিজেরাই বলছেন যে তাদের সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশে চালের সংকট দেখা যেতে পারে। কিন্তু ভারত সরকার তাদের নিজ দেশের স্বার্থটাই আগে দেখবেন, এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক নয়।

উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে যারা পরিচিত, তারা জানবেন যে কি পরিমান চাল ভারত থেকে সীমান্ত পার হয়ে আসে। এককালে ব্যাংকে কাজ করতাম, সেই সুবাদে জানতে পেরেছিলাম যে উত্তরাঞ্চলের ব্যাংকগুলোর এল.সি. ব্যবসার প্রধানতম অংশই হচ্ছে ভারত থেকে আসা চালের জন্যে এল.সি. (import L/C) খোলা। সোনালী থেকে ন্যাশনাল, জনতা থেকে ইসলামী সব ব্যাংকই এই সব এল.সি. খোলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল।

*

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ব্যর্থতা তাই আজ আমাদের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কি সেই বিপর্যয়? সামাজিক অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মত দেশে ছোট খাটো আকারে অস্থিতিশীলতা দানা বেঁধে উঠেছে। আমাদের দেশে সেটা হতে কতোক্ষণ?

উন্নয়ন গবেষণা ইন্সটিটিউট BIDS-এর গবেষণা পরিচালক আসাদুজ্জামান কি বলছেন শুনুন। সেই ২০০৫ সালে BIDS অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছিল যে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের আয়ের ৭০%-ই খাবারের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। খাবারের দাম যেহেতু এরপরে অনেকখানি বেড়েছে, তাতে আমরা এতোটুকু আন্দাজ করতে পারি যে ২০০৮ সালে এসে গরীবরা তাদের আয়ের অন্তত ৮০% খরচ করছে শুধু নুন দিয়ে দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্যে

বাংলাদেশে চালের দাম এক বছরে বেড়েছে ৬৭%। হরেক কারন তার। বন্যা আর সিডর এসে আমাদের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার ফলে কৃষিতে ব্যবহৃত জ্বালানী আর সার, দুটোরই দাম বেড়েছে। এমন কি টাকা ও রুপির ওঠা-নামাও আমাদের জন্যে ক্ষতিকর হয়েছে। রুপি আমাদের জন্যে আরো দুর্মূল্য হয়ে পড়েছে।

এর শেষ পরিণতি কি? অবধারিত ভাবেই গরীবের জীবনযাত্রার মান নেমে আসছে। সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় (real income) নেমেছে আনুমানিক ৫% বা তারও বেশী। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে +৬%, সেখানে গরীবের আয় আর জীবনযাত্রা প্রকৃত বিচারে নিম্নগামী!! এই অবস্থা কিভাবে চলতে পারে? আর কদ্দিন?

সামনে আসছে বোরো শস্য। সেটা যদি ভালো হয়, গরীবের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। সেই ভরসায়ই থাকতে হচ্ছে আপাতত। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের চড়া দাম আগামী কয়েক বছরে একটা স্থায়ী রূপ নিতে পারে, এমন আশংকা কিন্তু একেবারে অমূলক নয়।

WFP-র কর্মকর্তা আমাদের আশ্বাস দেন - “We are not in a famine situation.” এই আশার বাণী শুনেও কেমন যেন আশ্বস্ত হতে পারছি না…

*

বোনাস লিংক - সত্য বলতে গেলে খাদ্য মূল্যের এই সংকট বিশ্বব্যাপী রূপ ধারণ করেছে। আমরা যেমন ভাত খাই, মিশরের লোক তেমন খায় রুটি। সেই রুটির দাম বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক ভাবে। মিশরের গরীবের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে অসন্তোষ। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে কিছু লোক মারাও গেছে!! এই অবস্থার অবসান ঘটানো জরুরী। তাই প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারাক সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করেছেন বাড়তি রুটি প্রডাকশনের উদ্দেশ্যে। রুটি বানাতে আর্মি - আগে শুনেছেন কেউ??

তবে মুবারাকের দোষ আর কি? আন্তর্জাতিক বাজারে রুটির যে প্রধাণ উপাদান, সেই গমের দাম তিন গুণ হয়ে গেছে এক বছরের কম সময়ে!! মুবারাকের মতো স্বৈরাচারী একনায়কদের জন্যে এই সময়টা অত্যন্ত নাজুক একটা সময়, সন্দেহ নেই। তাদের ক্ষমতার বৈধতার সংকট একটা সব সময়ই রয়েছে। তার উপরে যদি সস্তায় ভাত-রুটির গ্যারান্টি দিতে তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে এমন সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, ভাবুন?

আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি শুনছেন? বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছেন তাঁরা …

এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা