আমাদের খাবার টেবিলে ডালের বাটিতে ইদানীং আর মসুর ডাল পাচ্ছি না। বদলে পাচ্ছি মুগের ডাল। মুগের ডালটা দামি খাবার, এতদিন তাই জানতুম। মুগের ডাল কেন, জানতে চাইলে জবাব এলো, মসুরের ডাল ১০৫ টাকা কেজি। তাই মুগের ডাল। ১০৫ টাকাটা হয়তো তথাকথিত অরগানিক দোকানের বাছাই করা ডাল, বাড়ির পাশের দোকানে তাই লোক পাঠালুম, জানা গেল, মসুরের ডালের কেজি ৯৮ টাকা আর মুগের ডাল ৮৮ টাকা কেজি।

আমি বললুম, আমাদের মাসে কত কেজি ডাল লাগে?

অনেক। ডাল খেতে হয়, ভর্তা হয় মাঝে-মধ্যে।

তো মোট কতটা ডাল লাগে?

হিসেব করে নিজেই বের করলুম কেজি চারেক।

বললুম, তো চার কেজি মসুর ডালের বদলে মুগের ডাল খেলে সাকুল্যে চল্লিশ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে, মাসে চল্লিশ টাকা বেশি খরচ করবার মতো সামর্থ্য আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।

উত্তর এলো, এটা সামর্থ্যের প্রশ্ন নয়, নীতির প্রশ্ন। ১০৫ টাকা করে ডালের কেজি হবে কেন? ডালকে না এতদিন বলা হতো গরিবের মাংস। সবার জন্যে না ডাল-ভাত নিশ্চিত করবার কথা। চালের দাম বেশি, ডালের দাম বেশি, এ কোন আমলে এসে পড়লুম! মসুরের ডালের বদলে মুগের ডাল খাব, এ হলো আমার প্রতিবাদ।

প্রতিবাদ! নীতিগত প্রতিবাদ! তাহলে আমার সায় আছে। আমিও এই প্রতিবাদের কাতারে যোগ দিলুম। চাল-ডালের দাম বেশি হওয়ার প্রতিবাদে এখন থেকে মসুরের ডাল খাওয়া বন্ধ।

আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না, আমীর হোসেন আমুর নিশ্চয়ই মনে থাকবে। স্বাধীনতার পরে একবার লবণের দাম খুব বেড়ে গিয়েছিল। তার আগে বলা হতো, এই দেশে নুন আর খুন সস্তা। লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় সে কথা বলা বন্ধ হলো।

তখন নতুন কথা প্রচলিত হলো। বঙ্গবন্ধু নাকি তার ভাষণে বলেছিলেন, আমি বাঙালিকে নুন দিয়ে পান্তা খাওয়াব না, চিনি দিয়ে পান্তা খাওয়াব। নুনের দাম চিনির চেয়ে বেশি হয়ে যাওয়ায় তখন লবণে চিনি ভেজাল দেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। রসিক বাঙালি তখন বলাবলি করতে লাগল, দেখলেন, বঙ্গবন্ধু তার কথা রেখেছেন। এখন চিনি দিয়েই পান্তা খেতে হচ্ছে।

আমরা আবার সেই স্বর্ণালী সময়ে ফিরে এলুম। এবার মসুরের ডালে মুগের ডাল ভেজাল দিতে হবে।

জিনিসের দাম কেন বাড়ে, অর্থনীতিতে ব্যাপারটা খুব সহজ করে বলা আছে। যদি চাহিদা বাড়ে, সেই তুলনায় সরবরাহ না বাড়ে, তাহলে দাম বাড়বে। তাই ভাবছি, তেলের দাম কেন বাড়ল। এখন তো দেশে তেলের চাহিদা বাড়ার কথা নয়। তেল তো দরকার হতো গণতন্ত্রের সময়ে, যখন বিদূষকগণ ক্রমাগতভাবে তেল দিয়ে যেতেন ক্ষমতাকেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের। যখন ৯ মণ তেল ছাড়া রাধাকে নাচানো যেত না। এখন সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই। এখন এত তেল কেন লাগছে, কে মাখছে কার পায়ে?

সয়াবিন তেল এক লিটার ১২০ টাকা! বাপরে!

দেশে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে, বা এখনই পরিস্থিতি সামলানো না গেলে নীরব দুর্ভিক্ষ আসন্ন, বলেছেন ড. আকবর আলী খান। আপনাদের মনে থাকতেও পারে, গত ২৪ জুলাই ২০০৭ এই একই কলামে ‘দ্রব্যমূল্য ও শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি’ নামে একটা লেখা লিখেছিলুম। পুরো লেখাটাই আসলে ছিল আকবর আলী খানের লেখা পরার্থপরতার অর্থনীতি শীর্ষক বই থেকে উদ্ধৃতি। ঐ বইয়ে আকবর আলী খান বলেছেন, অর্থনৈতিক সমস্যার কোনো রাজনৈতিক সমাধান নেই, তাতে নিজের উপলব্ধি জুড়ে দিয়ে বলেছিলাম, অর্থনৈতিক সমস্যার কোনো পুলিশি সমাধানও নেই।

এই সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েই অর্থনৈতিক সমস্যার পুলিশি সমাধানের চেষ্টা করেছিল। গুদামে গুদামে অভিযান চালিয়ে বলা হলো, পচা চাল গম মজুত করা হয়েছে। গুদাম সিল করা হলো। মধ্যস্বত্বভোগীরা জিনিসের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের উচ্ছেদ করতে বিডিআর অভিযান চালিয়েছে, এই খবর খুব বুক ফুলিয়ে প্রচার করা হলো। ব্যবসায়ীদের ডেকে ক্ষমতাবানেরা, রাজধানীতে আর জেলা শহরে বলতে লাগলেন, দাম কমান, লাভ কম করেন। তখনই আমার কলজে শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম! নিজের লেখা থেকে নিজেই উদ্ধৃতি দিই, “সরকার ক্ষমতা নিয়েই অবৈধ হাটবাজার উচ্ছেদ করেছে, গুদামে হানা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা ভীত, তারা এলসি খুলতে ভয় পায়, পাছে তাদের কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। যৌথবাহিনীর লোকজন স্থানীয় পর্যায়ে বা জাতীয় পর্যায়ে মন্ত্রী-মিনিস্টার প্রমুখ যতই ব্যবসায়ীদের ডেকে কম মুনাফা করার জন্য নসিহত করবেন,ততই জিনিসের দাম বাড়বে।” (প্রথম আলো, ৭ জুলাই ২০০৭)

১৯৭৪ সালে আমি পড়তুম ক্লাস ফোরে। রংপুরে থাকতুম। দুর্ভিক্ষ কাকে বলে, সেটা আমার মনে খুব ভয়াবহ একটা স্মৃতি হয়ে আছে। আমরা থাকতুম পিটিআইয়ের ভেতরে, তার বারান্দায় ক্ষুধিত কংকালসার একটা মানুষ মারা যাচ্ছে, শুনে আম্মা গরুর দুধ পাঠিয়ে দিলেন, তা নিয়ে দৌড়াচ্ছে বড় ভাইরা, সেটা মুখে ঢালার আগেই লোকটা মারা গেল, দুধ মুখ বেয়ে পড়ে যাচ্ছে…টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ছিল লংগরখানা, মানুষের বসবাস আর মৃত্যুর গন্ধ কত যে ভয়াবহ হতে পারে, আমি আজও সেই গন্ধ আমার নাকে টের পাই। ওই সময় আমাদের একটা কাজ ছিল রেশন তুলতে যাওয়া। আধ-মণ গমের বস্তা সাইকেলের চেনের ওপরের ভি আকারের দু্‌ই রডের মধ্যে রেখে দুই হ্যান্ডেলে সয়াবিন আর চিনির ব্যাগ ঝুলিয়ে ঠেলতে ঠেলতে মাইলখানেক পথ বেয়ে বাসায় ফিরতুম। ন্যায্যমূল্যের দোকানের সামনে থাকত মানুষের লাইন। বহুদিন পরে সেই লাইন আমি আবার দেখছি ঢাকায়, ধানমণ্ডি ৮ নম্বরের মাঠে, বিডিআরের ন্যায্যমূল্যের দোকানে। ভবিষ্যতের দুর্গতির আশংকার মেঘ আমার দু-চোখ ছেয়ে ফেলছে।

“Famines are easy to prevent if there is a serious effort to do so, and a democratic government, facing elections and criticisms from opposition parties and independent newspapers, cannot help but make such an effort. Not surprisingly, while India continued to have famines under British rule right up to independence…they disappeared suddenly with the establishment of a multiparty democracy and a free press.”

- অমর্ত্য সেন, “Democracy as a Universal Value”

অমর্ত্য সেন তার ডেভলপমেন্ট এজ ফ্রিডম প্রবন্ধে আরও বলেছেন, “a free press and an active political opposition constitute the best early-warning system a country threatened by famines can have.”

অথচ এই দেশে সারের জন্যে কৃষকরা ডিলারকে ঘেরাও করেছে, এই ছবি ছাপার পর বা সার-সংকটের খবর প্রকাশের পর সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিকে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল (অবশ্য অন্য অজুহাতে), এ রকম অন্তত দুটো উদাহরণ আমার নিজের জানা। এই ঘটনার সঙ্গে অমর্ত্য সেনের উপরের উদ্ধৃতি দুটো মিলিয়ে নিলে সহজেই বোঝা যায়, কত ধানে এখন কত চাল হচ্ছে।

আমরা আশা করছি, বোরো ফলন ভালো হবে। সার বিতরণ ঠিকভাবে হচ্ছে তো। রোববারে একটা টিভি চ্যানেলের খবরে দেখলাম ময়মনসিংহ এলাকায় সারের অভাবে রুগ্ন জীর্ণ বোরো ক্ষেতের ছবি দেখানো হচ্ছে!

সামনে গ্রীষ্ম। বলা হচ্ছে, এবার লোডশেডিং হবে দ্বিগুণ। তার মানে পানিরও অভাব হবে, কী ঢাকায়, কী কৃষিক্ষেত্রে। গ্যাসের অভাব তো লেগেই আছে। সিএনজির দাম বাড়ানো হচ্ছে। বহু ভোগ্যপণ্য পরিবাহী ট্রাক ও কভারড ভ্যান এখন সিএনজি চালিত। ফলে তাদের পরিবহনকৃত পণ্যের দামও বাড়বে।

সামনের গ্রীষ্মটা মানুষ কী করে কাটাবে, সরকার নিশ্চয়ই তা ভাবছে। আমি অবশ্য যতই ভাবি, চোখেমুখে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখি না।
ভিজিএফ কর্মসূচি যদি বজায় থাকে, তাহলে হয়তো হতদরিদ্র মানুষদের মুখে কিছু আহার জুটবে। কিন্তু দরিদ্রদের কী হবে? কী হবে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্তের?

কী ভাবে সংসার চলে, ধরা যাক, একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষকের? যিনি হাজার আটেক টাকা বেতন পান। বা প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্তা শুরুতে বেতন পান ১০ হাজার টাকা। তাদের ঘরে যদি গোটা ছয়েক পোষ্য থাকে, চার হাজার টাকা বাসাভাড়া দিয়ে তার হাতে যা থাকে, তাতে চলে কী করে? ২৭০০ টাকা তো শুধু চাল কিনতেই লাগবে। আর থাকল কী? চালের দাম বাড়লে রিকশাওয়ালা তার ভাড়া বাড়াবে, মুচি জুতো সেলাই করে বেশি দাবি করবে, সবটার চাপ পড়বে ওই মধ্যবিত্তটির ঘাড়ে।

বিশ্বব্যাংক যতই খাদ্যে আর কৃষিতে ভর্তুকি দিতে মানা করুক, সেটা দিতেই হবে। খাদ্য মজুদ কম থাকলে ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকারকে তা আমদানি করতে হবে।

অমর্ত্য সেনের উদ্ধৃতিটা এবার অনুবাদ করি - “দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করা খুব সহজেই সম্ভব, যদি গুরুতরভাবে তা করার চেষ্টা করা হয়। আর তা করতে পারে একটা গণতান্ত্রিক সরকার, যাকে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে, সাথে সাথে বিরোধী দলের সমালোচনা এবং স্বাধীন সংবাদপত্র।”

এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা