ঢাকায় শেষ বার একুশে কাটিয়েছিলাম ১৯৯১ সালে। এরশাদ সরকারের পতন ঘটে গেছে কয়েকমাস হল। নির্বাচনের আর এক সপ্তাহ বাকি। সারা শহরে নির্বাচনী উত্তেজনা। কিন্তু সে উত্তেজনা আজকালকার মত হিংসাপূর্ণ নয়। আর তাই, আমরা মহল্লার বন্ধুরা — আট দশ জন হব, Class 8 থেকে SSC/O’Level এর জন্য পড়ছি — সবাই মাঝ রাতে শহীদ মিনারে যেতে পেরেছিলাম কোনো মুরুব্বি ছাড়া।

ঠিক বারোটার সময় শাহাবুদ্দিন সাহেব আসলেন, জনতার তালির মাঝে ফুল রাখলেন। তারপর একে একে আসলেন রাজনৈতিক নেতারা, কোন গন্ডগোল ছাড়াই শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। তারপর আসলেন বিভিন্ন সুশীলরা — তখন বোধ হয় এই কথাটা বলা হত না, তা হলে ওনাদের নাম কি ছিল?

১৯৯১-এ বাংলাদেশে গনতন্ত্রের যাত্রা সবে শুরু। এরপর দেশে গনতন্ত্র আসল, আবার চলেও গেল। আর সেই একুশের কয়েক মাস পর বাবা-মা’র সাথে আমি চলে আসলাম বিদেশে। এরপর বহুবার দেশে গেছি, কিন্তু কখনোই একুশে’র সময়ে নয়। গত ১৬ বছরের মত এবারো একুশে কাটল বিদেশে।

বিদেশ, কিন্তু সত্যি বিদেশ কি?

বিদেশে কি গভীর রাতে news channel শহীদ মিনার থেকে সরাসরি সম্প্রচার করে ইয়াজুদ্দিন আহমেদ, তার উপদেষ্টা আর জলপাই সমর্থকদের? বিদেশে কি আধ ডজন TV channel দিনভর দেখায় প্রামাণ্যচিত্র, বিশেষ গানের অনুষ্ঠান, আর ভাষার ওপর এক গাদা talk show?

আমরা সবাই জানি জিন্নাহ ঢাকায় বলেছিলেন একমাত্র উর্দু-ই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, আর ছাত্ররা তখনি তার প্রতিবাদ করেছিলেন। আপনারা কেউ কি সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি’র video দেখেছেন? আমি এটা প্রথম দেখলাম একটি TV chanel-এ। দেখলাম একজন নামী গায়ক খুব উত্তেজনার সাথে হিন্দী আগ্রাসনের প্রতিবাদ করছেন একটি talk showতে। আরেকটি Channel দেখাল James এর গান – দুখিনি দুঃখ কোরো না। রাতে দেখলাম জ়হির রায়হানের ‘জ়ীবন থেকে নেয়া’। আর যেকোনো খবরের lead item হল ইয়াজুদ্দিন বাহিনী।

এটা কি সত্যি বিদেশ?

জ়ী পাঠক। সবকিছুর পরেও, কলকাতা বিদেশ। সেখানে যতই TV তে একুশে’র অনুষ্ঠান দেখানো হোক না কেন, সাধারণ কলকাতা পরিবার কোন বাংলাদেশী channel দেখতে পারে না।

কেন?

রাজনীতি।

“There are the same streets and shops and dishes and hotels, the same Star and Zee TV channels, the same moustachioed men in motorbikes and brisk women working behind the bank counters, the same juxtapositions of colonial and modern architecture, the same squalid streets with boys carrying planks on their heads, and the same wealthy babes schooled on satellited repeats of The Bold and the Beautiful who hang around outside pasta restaurants saying: ‘It’s so boring here, Tina. Let’s go to Maxi’s, yaaah?’”

এভাবেই লাহোর আর দিল্লী’র তুলনা করেছেন Patrick French তার Liberty or Death বইটিতে। লাহোর আর দিল্লী, আর করাচি আর মুম্বাই, এবং, কলকাতা আর ঢাকা — এই কথাগুলি সবার জন্যেই খাটে।

বইটি ১৯৯৭ এর। গত ১০ বছরে এই homogenising process আরো গাঢ় হয়েছে। কিন্তু যে রাজনীতির কারণে দেশভাগ, সেই রাজনীতিও থেমে নেই।

লাহোর আর দিল্লী’র মাঝে একটি বড় তফাতের কথা লিখেছেন French — জিন্নাহ, যিনি লাহোরে ভালভাবেই আছেন, কিন্তু দিল্লীতে একেবারেই নেই। ওই রাজনীতির জন্যই কলকাতায় সুভাষ বসু আছেন, আর ঢাকায় শেখ মুজিব।

সেই দেশভাগের রাজনীতির পিছনে ছিল হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের ব্যাপক জনসমর্থণ — দেখুন জ়য়া চ্যাটার্জ়ী’র Bengal Divided আর তানযীম মুর্শীদে’র The Sacred and the Secular।

দেশভাগের ৬০ বছর হয়ে গেল। পদ্মা-গঙ্গায় অনেক পানি বয়ে গেল। ভবিষ্যতে কি হবে আমরা জানি না। কিন্তু বর্তমান তো আমাদের হাতে। জটিল রাজনীতির মারপ্যাঁচে আরব দুনিয়া বহু ভাগে ভাগ। কিন্তু TV’র কল্যাণে ১৩০০ বছরে প্রথমবারের মত আরবরা আজ এক ভাষায় কথা বলতে শিখছে (দেখুন http://www.slate.com/id/2063956/)। আমরা আমাদের আকাশ খুলে দিয়েছি। TV’র কল্যাণে আমরা ভালই হিন্দী শিখেছি। কিন্ত কলকাতা’র আকাশ এখনো আমাদের জন্য বন্ধ।

প্রিয় পাঠক, TVও তো পুরানো প্রযুক্তি। আমরা কি ব্লগর ব্লগর করে পারি না কলকাতা’র জানালা খুলে দিতে?

এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা