সত্যজিত রায়ের অমর চলচ্চিত্র ‘অশনি সংকেত‘ অনেকেই দেখে থাকবেন। শাশ্বত গ্রাম বাংলা এই ছবির পটভূমি, আর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ এর বিষয়বস্তু। গ্রামের মানুষের ধীর-স্থির জীবন কিভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল তেতাল্লিশে, ক্ষুধার নির্মম ছোবল কিভাবে তাদের বারংবার দংশন করেছিল - সত্যজিত দেখিয়েছেন এই ছবিতে। সেই গাঁয়ের একমাত্র ব্রাক্ষ্মন সৌমিত্র আর তার ফুটফুটে বৌ ববিতা, তাদের চারিপাশের জীবনযাত্রা আস্তে আস্তে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ বাংলার অনেক শিল্পীকেই ভয়ংকরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জয়নুল এঁকেছিলেন তার কাক কুকুর আর মৃতপ্রায় মানুষের স্কেচ। মৃনাল সেন সৃষ্টি করেছিলেন ‘আকালের সন্ধানে‘ ছায়াছবিটি। অশনি সংকেত চলচ্চিত্রটিও বিভূতিভূষনের একটি উপন্যাসের সিনে-রূপ। (সেই সময় নিয়ে আরো কোন গল্প বা উপন্যাসের কথা কি কেউ জানেন?)

আজ সকালে খবর পড়তে গিয়ে সেই অশনি সংকেতের কথাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। বিলেতের ফিনানশিয়াল টাইমস পত্রিকায় এসেছে এক ভীতিকর হেডলাইন -Twenty-year high in rice prices sparks fears। যা লিখেছে তার প্রায় পুরোটাই মন্দ খবর -

থাই বলেন আর মার্কিন বলেন - সব চালের দাম বাড়ছে!

বিশ্ববাজারে চালের দাম গত বিশ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে। দুনিয়া জুড়ে সর্বপ্রকার খাদ্যদ্রব্যের দামের এখন উর্ধ্বগতি। চালের দাম বাড়ার ফলে এশিয়া মহাদেশের নীতি নির্ধারকরা বড়-সড় সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন, কারন এশিয়ার ২৫০ কোটি লোক বেঁচে থাকে দু’বেলা এই চাল খেয়ে।

থাইল্যান্ডের চালের দাম - যা বিশ্ববাজারে চালের মূল্যের একটি প্রধান সূচক - গত সপ্তাহে সেই চালের দাম টন প্রতি ৫০০ ডলার অতিক্রম করেছে। আজ থেকে বহু বছর আগে ১৯৮৯ সালে দাম শেষবারের মতো এতো উপরে উঠেছিল। এর ফলে চাল আমদানীকারক দেশগুলো সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে, সামনের দিনগুলোতে তারা চালের নির্বিঘ্ন সরবরাহের আশ্বাস চাইছে।

ম্যানিলায় অবস্থিত রয়েছে আন্তর্জাতিক চাল গবেষণা সংস্থা, সংক্ষেপে IRRI। তার প্রধান রবার্ট জিগলার বলেছেন যে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক ও সরকার সমূহের আশংকিত হবার যথেষ্ট কারন আছে। চালের দাম বেড়ে গেলে সমাজে নৈরাজ্য ও অস্থিরতা প্রায় অবধারিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে, ইতিহাস অন্তত আমাদের এই শিক্ষাই দেয়।

থাই ছাড়াও উদাহরণ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ চাল উৎপাদনকারী দেশ। শিকাগোর শস্য বাজারে সেই মার্কিন চালের দাম এখন টন প্রতি ৪০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর এই সময়ে মার্কিন চালের দাম ছিল মাত্র ২৩০ ডলার। মানে দাম এক বছরে ৭৫% শতাংশ বেড়েছে!

রপ্তানীকারকরা বলছে ঘরের চাল ঘরেই থাকুক

এই দাম বাড়ার কারনে বড় বড় চাল উৎপাদনকারী দেশগুলো - যেমন ভিয়েতনাম, ভারত ও মিশর - তাদের চাল রপ্তানী অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। ওদের নিজেদের চালের মজুদও (inventory) এখন বেশ কম। তাই স্থানীয় বাজারে চালের সরবরাহ নিশ্চিত করাটাই এখন ওদের প্রধান উদ্দেশ্য। দাম যেন নিজেদের জনসাধারণের নাগালে বাইরে চলে না যায়, এই কারনে এই দেশগুলো তাদের চাল রপ্তানীর ওপর বিভিন্ন বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এবং প্রথমবারের মতো ফিলিপিন সরকার চাল সরবরাহের ব্যাপারে ভিয়েতনামের কাছ থেকে আশ্বাস চেয়েছে। ফিলিপিনের প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া মাকাপাগাল-আরোয়ো ২০০৮-০৯ সালে পর্যাপ্ত পরিমানে চাল সাপ্লাইয়ের গ্যারান্টি চেয়েছেন পার্শ্ববর্তী ভিয়েতনাম সরকারের কাছে। উল্লেখ্য যে ফিলিপিন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চাল আমদানীকারক দেশ।

চালের দামের উর্ধ্বগতির পেছনে কারন কি কি? ডিমান্ড ও সাপ্লাই - উভয় দিক থেকেই চাপ আসছে। বিশেষজ্ঞরা যে কয়টি মূল কারন দর্শান, সেগুলো হলো -

১) চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে সাম্প্রতিক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া শস্য উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

২) পাশাপাশি ব্যাপক নগরায়নের ফলে চাল উৎপাদনের জন্যে পূর্বে বরাদ্দ অনেক ক্ষেত-খামার ভরাট করে ফেলা হয়েছে, তার উপর রাস্তা-ঘাট বা বিল্ডিং নির্মান করা হয়েছে। এতে চাল উৎপাদনের পরিমান কমে গেছে।

৩) আরো আছে চীন ও ভারত সহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ থেকে চালের বাড়ন্ত চাহিদা। এইসব দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজের সকল স্তরে বিভিন্ন প্রকারের খাবারের চাহিদা বেড়েছে।

তাই দেখা যাচ্ছে যে এই মৌসুমে বিপুল পরিমান চাল উৎপাদন করেও (বিশ্বব্যাপী সর্বমোট ৪২ কোটি টন), এতো চাল উৎপাদন করেও চাহিদার সাথে তাল মেলানো যাচ্ছে না। ডিমান্ডের সাথে সাপ্লাইয়ের ফারাক বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ টন। এই ৩০ লক্ষ টনের ঘাটতি কিভাবে মিটবে? তাই চালের যা মজুদ ছিল বিভিন্ন দেশে, সেই সবের উপর এখন হাত পড়তে শুরু করেছে।

গোডাউনে মজুদও নিম্নমুখী… এখন উপায়?

মাত্র কয়েক বছর আগে ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী চালের মজুদ ছিল ১৫ কোটি টন। অথচ সেই সংখ্যা আজকে মাত্র ৭ কোটি টনে এসে নেমেছে। মানে অর্ধেকেরও কম। বিশ্বের চালের মজুদ এখন বিগত ২৫ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। থাইল্যান্ডের এক শীর্ষস্থানীয় চাল ট্রেডিং সংস্থার নাম রাইসল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল। তার চেয়ারম্যান ভিচাই স্রিপ্রাসার্ট বলেছেন যে চালের দাম “আরো অনেক অনেক” বাড়বে। এমন খবরও পাওয়া গেছে যে থাই চাল রপ্তানীকারকরা তাদের রপ্তানী চুক্তি পর্যন্ত ভঙ্গ করছেন! কেন না স্থানীয় বাজারেই তারা চালের জন্যে বেশ ভালো দাম পাচ্ছেন! তাই কষ্ট করে আর বিদেশে বিক্রি করতে যেতে হচ্ছে না।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভিয়েতনামে ধান কাটার মৌসুম আসবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই নতুন সরবরাহের ফলেও চালের দাম তেমন একটা কমবে না। হয়তো অল্প কিছুদিনের জন্যে দামের পেছনে উর্ধ্বমুখী চাপ একটু থামতে পারে। কিন্তু লং টার্মে দাম আবার বাড়া শুরু করবে।

ফিনানশিয়াল টাইমসের সাংবাদিক একদম শেষে এসে আসল কথাটা তোলেন। সত্তরের দশকের পরে এশিয়া মহাদেশে আর কোন ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়নি। কিন্তু চাল এবং অন্যান্য অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর চড়া দাম ইতিমধ্যে বেশ কিছু দেশে অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। এই নৈরাজ্য ও অস্থিরতা অদূর ভবিষ্যতে আরো সংকটময় পরিস্থিতি তৈরী করবে, এমনটা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে। সামাজিক স্থিতিশীলতা আজ হুমকির সম্মুখীন হতে চলেছে।

*

এই সব পড়ে সাত সকালে মনে পড়লো অশনি সংকেতের কথা। সেইদিন কি আবার আসছে? চাল উৎপাদনে কি আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি? আমাদের নীতি-নির্ধারকরা কি ভাবছেন এইসব নিয়ে? আসন্ন সংকট তারা কিভাবে মোকাবেলা করবেন?

বোনাস লিংক

১) খাদ্য মূল্য সংকটের উপর ফিনানশিয়াল টাইমস পত্রিকা বেশ কড়া নজর রাখছে। এই বিষয়ে ওদের সর্বশেষ খবরাখবর পাবেন এখানে - http://www.ft.com/foodprices

২) ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাবার পর অশনি সংকেত ছবিটির রিভিউ বেরিয়েছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় - পড়ুন এখানে

এই লেখকের শেষ কয়েকটি লেখা